বশিরুল ইসলাম:
বাইরাইনে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের কয়েকহাজার শ্রমিকের ভিসা বাতিল করেছে ঐ দেশের সরকার ফলে বাংলাদেশীদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে। মাসিক মাত্র ১০ দিনার ট্যাক্স না দেয়াই এ ভিসা বাতিলের কারণ বলে জানা গেছে বাহরাইনে অবস্থানরত শামছুল ইসলাম ও রুবেল নামে দুই শ্রমিকের নিকট থেকে। এই সংখ্যা প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভিসা বাতিল হয়ে যাওয়ায় বিপুল বাংলাদেশী অবৈধ হয়ে পড়েছেন। ফলে এখন তাদের ওপর চলছে গ্রেফতার অভিযান।
অফিসিয়ালি কোনরকম ঘোষনা না দিয়ে অভিযান শুরু হলেও এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশীদের ওপর। পুলিশি ধরপাকড় এড়াতে তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন । হাজার হাজার শ্রমিক দালালের প্রলোভনে পড়ে দেশটিতে গিয়ে এখন কাজ না পেয়ে মানবেতর জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।
নয়াদিগন্তকে বিশেষজ্ঞদের দেওয়া তথ্যমতে, ভিসা ট্রেডিংয়ের অংশই হচ্ছে ফ্রি ভিসা। শ্রমিকরা স্পন্সরের আওতায় চাকরি করে না। কিন্তু নিয়োগকারী কোম্পানির সাথে আগেই দালালদের অলিখিত চুক্তি থাকে, কোম্পানির নামে শ্রমিক যাবে, কিন্তু সে কোম্পানিতে তারা কাজ করবে না; অন্য যেকোনো স্থানে স্বাধীনভাবে কাজ করবে। এটাই হচ্ছে মূল সমস্যা। দেখা গেছে শ্রমিক সেখানে যাওয়ার পর ফ্রি ভিসায় অনেকে কাজ পায় না। উল্টো প্রতারিত হয়ে কস্টের মধ্যে দিন কাটাতে হয়। ভুক্তভোগীরা বলেন, বাংলাদেশ সরকারের উচিত, ওই দেশের লেবার মিনিস্ট্রির সাথে দ্রুত বৈঠক করা, যাতে কোম্পানি মালিকদের এ ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতার মধ্যে আনা যায়। চুক্তি মোতাবেক শ্রমিক যাবে এবং সে ক্ষেত্রে তারা চাকরি নিশ্চিত করবে। এ বিষয়টিই যৌথ কমিটির সাথে বৈঠক করে তুলে ধরতে হবে। তাদের মতে, স্থানীয় পুরনো শ্রমিকদের সাথে ওই দেশের মালিকদের যোগসাজশেই এধরনের অনিয়ম হচ্ছে।
গত রবিবার ১৯ মার্চ দিন ও রাতে কুমিল্লার চান্দিনা থানার গল্লাই ইউনিয়নের শামছুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম, বাচ্চু মিয়া ও মাইজখার ইউনিয়নের রুবেল সহ আরো অনেকের সাথে কথা বলে জানাযায়, বর্তমানে বাহরাইনে বেশির ভাগ বাংলাদেশী কর্মীর দিন কাটছে কষ্টের মধ্যে। এর মধ্যে গত ১৫-২০ দিন আগে বাহরাইনের লেবার মার্কেট রেগুলেটরি অথরিটি (এলএমআরএ) ফ্রি ভিসায় যাওয়া কয়েক হাজার শ্রমিকের ভিসা বাতিল করে দিয়েছে। এ নিয়ে গালফ নিউজসহ একাধিক পত্রিকায় সংবাদও প্রকাশ হয়েছে। তারা বলেন, এমন সংবাদের পর শত শত শ্রমিক বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে অবস্থান নেন। ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এর পর থেকেই দূতাবাস ভিসা সংক্রান্ত সব কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। কী কারণে বাহরাইন সরকার হঠাৎ কর্মীদের ফ্রি ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছেÑ এমন প্রশ্নের উত্তরে দশ বছর ধরে দেশটিতে থাকা প্রবাসী শ্রমিক বাচ্চু মিয়া জানান, যারাই ফ্রি ভিসায় আসছে তাদের প্রতি মাসের জন্য সরকার নির্ধারিত ১০ দিনার অর্থাৎ দুই হাজার ৫০ টাকা ভ্যাট-ট্যাক্স নির্ধারণ করে দিয়েছে লেবার মার্কেট রেগুলেটরি অথরিটি। কিন্তু অধিকাংশ শ্রমিকের নামে সরকার নির্ধারিত এ ট্যাক্স পরিশোধ না করার কারণে তাদের ভিসা বাতিল করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ফ্রি ভিসায় এসে শ্রমিকরা বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন, রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফল, মাছ বিক্রি করছে, যা এ দেশের আইনে নিষিদ্ধ। তারপরও হাজার হাজার শ্রমিক দালালের খপ্পরে পড়ে এখন বিপদের মধ্যে আছেন। তারা না পারছেন দেশে ফিরতে না পারছেন শান্তিতে কাজকর্ম করতে। এমন শ্রমিকের সংখ্যা অনেক। বাহরাইনে অবস্থানরত সোলেমান নামে আরো এক শ্রমিক জানান, এ দেশে স্থানীয় লোকজন ও পুরাতন শ্রমিকদের জোগসাজসে দালালদের খপ্পরে পড়েই মূলত চার-পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে বাহরাইনে আসছেন বাংলাদেশী শ্রমিকারা। না জেনে এই ভিসায় এসে তারা বিপদে পড়ছেন। কারণ বাংলাদেশী শ্রমিক বেশি হয়ে গেছে। সেই তুলনায় কাজ কম। পরিস্থিতি এমন হয়েছে, অনেকে ঠিকমতো তিন বেলার খাবারও জোটাতে পারছে না। কিভাবে ১০ দিনার সরকারি ফি দেবেন তারা? তার দেখা মতে, যারা দুই বছরের ফ্রি ভিসায় এসেছেন, তাদের কারো তিন থেকে ছয় মাস না যেতেই লেবার মার্কেট অথরিটি ভিসা বাতিল করে দিচ্ছে। কারণ ভ্যাট ট্যাক্স কোম্পানি পরিশোধ করছে না। এখন যারা ধরা পড়ছেন তারা জেল জরিমানা দিয়েই দেশে ফিরছেন। যেহেতু ভিসার সমস্যা তাই এই মুহূর্তে দেশ থেকে কারো না আসাই উচিত বলে মনে করেন তিনি।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে দুই মাসে দেশটিতে বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়ে গেছেন ৯ হাজার ৬৫৫ জন কর্মী। এর মধ্যে নারী শ্রমিক পাঁচজন। এর আগে ২০১৬ সালে দেশটিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন ৭২ হাজার ১৬৭ জন। এর মধ্যে ৭৯ জন মহিলাকর্মী।

No comments:
Post a Comment