সাখাওয়াত হোসেন সেলিম, বিশেষ যুক্তরাষ্ট্র থেকে জানান :

বহুল আলোচিত কুমিল্লা বিভাগের নাম ময়নামতি, কুমিল্লা অথবা লালমাই-এ তিনটির যেকোন একটি হবে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র সফররত বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ বাংলাদেশ মিশনের বঙ্গবন্ধু মিলনায়তনে স্থানীয় সময় ১৯ জুলাই বুধবার সন্ধ্যায় জাতি
সংঘের হাই লেভেল পলিটিক্যাল ফোরামে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণ পরবর্তী এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ইউএসএনিউজঅনলাইন.কম এর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, কুমিল্লা বিভাগ হয়ে গেছে। নামকরণের বিষয়টিও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। যেকোন সময় এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে।
“দারিদ্র্য নির্মূল এবং পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বা এসডিজি বাস্তবায়নের অগ্রগতি বিষয়ক জাতিসংঘের ‘হাই লেভেল পলিটিক্যাল ফোরাম (এইচএলপিএফ)’ এর কার্যক্রম গত ১০ জুলাই থেকে শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯ জুলাই। পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের নেতৃত্বে ২২ সদস্যের একটি বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল এ সম্মেলনে যোগ দেয়। সম্মেলনে যোগদানের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতেই মূলত এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি (প্রেস) নূর এলাহী মিনার সঞ্চালনায় পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ছাড়াও সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কারি আবুল কালাম আজাদ, স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, এইচএলপিএফ এর মূল অংশ ছিল ‘ভলান্টারি ন্যাশনাল রিভিউ’ বা ভিএনআর সেগমেন্ট। ১৭-১৯ জুলাই পর্যন্ত মন্ত্রী পর্যায়ের এই সিগমেন্টে স্বপ্রনোদিতভাবে বাংলাদেশসহ জাতিসংঘের ৪৪টি সদস্য রাষ্ট্র স্ব স্ব দেশের এসডিজি বাস্তবায়নের অগ্রগতি বিষয়ক প্রতিবেদন উপস্থাপন করে। বাংলাদেশ এ রিপোর্ট উপস্থাপন করে ১৭ জুলাই অপরাহ্ণে ভিএনআর-এর ৩নং সিগমেন্টে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০১৫ সালে এমডিজি বাস্তবায়ন শেষে জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্রসমূহের জন্য এসডিজি প্রণয়ন করে। এমডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিক অঙ্গণে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমডিজি বাস্তবায়নে তাঁর সরকারের সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ ‘জাতিসংঘ এমডিজি অ্যাওয়ার্ড’সহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হন। এমডিজি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে শুরু থেকেই বাংলাদেশ সরকার এসডিজি বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্টভাবে এবং লক্ষ্য স্থির করে কাজ শুরু করে। সরকার এসডিজি’র সফল বাস্তবায়নের লক্ষে একজন “এসডিজি বাস্তবায়ন বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কারী” নিয়োগ দিয়েছে যা বিশ্বের অনেক দেশেই নেই।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এসডিজি গ্রহণের পর গত দেড় বছরে বাংলাদেশ এর বাস্তবায়নে কতটা সফলতার সাথে এগিয়ে চলছে, এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জসমূহ কী এবং এসকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশলসমূহ কী তা নিয়ে বিস্তারিতভাবে বাংলাদেশ স্বপ্রনোদিতভাবে একটি জাতীয় রিপোর্ট প্রণয়ন করে যা এইচএলপিএফ-এর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিসগমেন্ট ভিএনআর-এ উপস্থাপন করা হয়।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ভিএনআর সিগমেন্টে নেতৃত্ব দেন। “ইরাডিকেটিং প্রোভার্টি এন্ড প্রমোটিং প্রোসপারিটি ইন এ চেঞ্জিং ওয়ার্ল্ড শিরোনামে এসডিজি বাস্তবায়নের অগ্রগতি বিষয়ক বাংলাদেশের এই জাতীয় রির্পোট উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ সরকারের এসডিজি বাস্তবায়নের মুখ্য সমন্বয়কারী মো: আবুল কালাম আজাদ।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, একটি মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে এই রির্পোট উপস্থাপন করা হয়। এসডিজি’র ১৭টি অভীষ্টের মধ্যে বাংলাদেশের রিপোর্টটিতে ৭টি অভীষ্ট যথা: দারিদ্র্য নির্মূল (অভীষ্ট-১), ক্ষুধামুক্তি (অভীষ্ট-২), সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ (অভীষ্ট-৩), লিঙ্গ সমতা (অভীষ্ট-৫), শিল্প উদ্ভাবন ও অবকাঠামো (অভীষ্ট-৯), জলজ জীবন (অভীষ্ট-১৪) ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব (অভীষ্ট-১৭)- বাস্তবায়নের অগ্রগতি উল্লেখ করা হয়। এসডিজিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হিসেবে উল্লেখ করে এর বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার গৃহীত বিভিন্ন কৌশল যেমন- সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এসডিজিকে সন্নিবেশিত করা, বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তিতে এসডিজিকে অন্তর্ভুক্ত করা, এসডিজি ট্রাকার সৃষ্টি, আন্ত:মন্ত্রণালয় এসডিজি বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি গঠন, মন্ত্রণালয়ের ম্যাপিং এবং ডেটাগ্যাপ এনালাইসিস এর মতো বিষয় গুলোও এখানে তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানান হয়, ভিএনআর প্রেজেন্টেশনে দেশের উন্নয়নের পরিমাপক হিসেবে বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক প্রবৃদ্ধির তথ্য প্রদর্শন করা হয়। এখানে দেখানো হয় উচ্চ ও নি¤œ দারিদ্র্য রেখা যথাক্রমে ২৪.০৩% ও ১২.০৯% ভাগে নেমে এসেছে, যা ১৯৯১ সালে ছিল যথাক্রমে ৫৬.০৭% ও ৪১.০১%। প্রধানমন্ত্রীর প্রাধিকার প্রকল্প একটি বাড়ি একটি খামারের পাশাপাশি উঠে আসে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার রক্ষা ও কল্যাণ, ডিজিটাল ফিনানসিয়াল সার্ভিস এবং জনগণের দোরগোড়ায় সেবা প্রদানের লক্ষে গৃহীত বিশেষ বিশেষ কর্মসূচি গুলো। পদ্মা সেতুসহ মেগা অবকাঠামো প্রকল্পসমূহও এ রিপোর্টে স্থান পায়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৫টি ভিশন, যথা: ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা, ২০৩০ সালে এসডিজি বাস্তবায়নের মাধ্যমে উন্নয়নের মহাসড়কে উপনীত হওয়া, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়া, ২০৭১ সালে স্বাধীনতার শতবর্ষ পূর্তিতে বাংলাদেশকে উন্নয়নের বিস্ময়ে পরিণত করা এবং ২১০০ সালে ডেল্্টা প্লান বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে নিরাপদ ব-দ্বীপ হিসেবে গড়ে তোলা।
মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফাকামাল বলেন, বাংলাদেশ থেকে আগে অর্থ পাচারের সুযোগ থাকলেও, এখন আর তেমন বেআইনী পথে যাবার প্রয়োজন হবে না। বৈধভাবে উপার্জিত অর্থ পাচারের কোন প্রয়োজন হবে না। ইচ্ছা করলেই যে কোন দেশে যে কোন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা যাবে। বিদেশীরা যেমনিভাবে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছেন, একই সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশীদের জন্যেও। মন্ত্রী বলেন, ব্যাংক থেকে বিপুল অংকের ঋণ নিয়ে যারা প্রতারণা করেছেন, তাদের বিচার চলছে। কেউই রেহাই পাবে না দুর্নীতি করে।
জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন ১০ দিনব্যাপী এইচএলপিএফ এর এই অধিবেশনের সার্বিক সমন্বয় করেন। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে অন্যান্যদের সাথে আরও অংশ নেন পরিকল্পনা কমিশনের জেনারেল ইকোনোমিকস ডিভিশনের সদস্য ড. শামসুল আলম ও পিকেএসএফ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল করিম, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) এন এম জিয়াউল আলম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জিআইইউ এর মহাপরিচালক আবদুল হালিম।
রিপোর্ট : সাখাওয়াত হোসেন সেলিম
সম্পাদক, ইউএসএনিউজঅনলাইন.কম
নিউইয়র্ক, ফোন : ১-৬৪৬-২৪৪-৯৯২৯।