বশিরুল ইসলাম।
নানা সমস্যা আর জনবল সংকটে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ফরেনসিক বিভাগ। স্পর্শকাতর এই বিভাগে ৬টি ডাক্তার পদ থাকলে ও সেখানে মাত্র ৪জন ডাক্তার দিয়ে চলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, ময়নাতদন্ত ও ভিকটিম পরীক্ষা। অভাব রয়েচে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোগত সুবিধার। অবকাঠামোগত সুবিধা না থাকায় এমবিবিএস পাশ করা শিক্ষার্থীরা শিখার সুযোগ কম পাচেছ ফলে দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছেনা
। ফরেনসিক বিভাগে ডাক্তারদের কাজ করার ইচ্ছা থাকলেও তারা নিরাপত্তার কারণে কাজ করতে চান না। কেননা এখানে অপমৃত্যু, হত্যা, আত্মহত্যা ও ধর্ষণের মত স্পর্শ কাতর বিষয় গুলো পরিচালনা করতে হয়। অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক প্রধান দুইটি পদ শূন্য থাকায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান, ভিকটিম পরীক্ষা সহ মৃত দেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দিতে রীতিমত হিমশিম খেতে হয়। অনেক সময় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেরিতে দিতে হয়। যার ফলে ভিকটিম বা ভিকটিমের স্বজনরা সঠিক বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। এখানে বায়োলজীক্যাল পরিক্ষা হলেও অনেক পরীক্ষা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ ফরেনসিক বিভাগ থেকে করে আনতে হয়। যার ফলে দীর্ঘ সূত্রিতা দেখা দেয়। এই বিভাগের ডাক্তারদের সরকারি ছুটি নেই, অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য তাদের অতিরিক্ত ভাতা নেই এমনকি যাতায়াতের জন্য যাতায়াতা ভাতাও নেই। ফলে ডাক্তারগন ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে দায়িত্ব পালনে অনিহা প্রকাশ করে এবং ডাক্তার এসে থাকতে চায়না অন্যত্র চলে যায়। তাছাড়াও মর্গের ভেতরে একটি পাখা থাকলেও সেটি দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে, এসি ঠিকভাবে কাজ করেনা, মর্গের চারপাশের কাঁচ গুলো ভাঙ্গা, একটু বৃষ্টি হলে সব ভেতরে চলে আসে, দেওয়াল গুলো স্যাত স্যাতে হয়ে সেখানে আগাছা জন্ম নিচ্ছে।
বিশ^স্ত সূত্রে জানা যায়, ১৯৯২ সালে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ জনবল সংকটে । নানা সংকট আর সমস্যার মধ্য দিয়ে কাজ করছে বিভাগটি। এই বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ ৬টি পদের মধ্যে প্রধান ২টি পদ খালি। ফরেনসিক বিভাগের অধ্যাপক পদটি শূণ্য, সহযোগী অধ্যাপক পদে ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ডা. কামদা প্রসাদ সাহা, সহকারী অধ্যাপকের পদটিও শূণ্য, প্রভাষক পদে ৩জন দায়িত্ব পালন করছেন ডা. ওমর ফারুক, ডা. শারমিন সুলতানা ও ডা. সালমা আক্তার। এখানে ময়নাতদন্তের সরঞ্জামের অভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় ও বিলম্বে প্রতিবেদন দিতে হয়। তাছাড়া বিভিন্ন কারণে অকারণে ও বিব্রতকর পরিস্থিতির স্বীকার হতে হয়। এই বিভাগের ডাক্তাররা অনেক সময় আদালতে হাজির হয়ে স্বাক্ষী দিতে হয়, ভিকটিম পরীক্ষা করতে হয়, পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা আবার মিডিয়ার সাথে কথাও বলতে হয়। অধিকাংশ সময় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন অনেক দেরিতে পায় ভিকটিম বা তার স্বজনরা। যার ফলে মামলা বা বিচার কার্যে বিলম্ব হয় এবং ভিকটিম বা তার স্বজনরা সঠিক বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশংকা থাকে। বিভিন্ন ডাক্তারদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, একটা সময় ফরেনসিক মেডিসিনে ভাল শিক্ষক ছিল কিন্তু এই বিভাগে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় দক্ষ শিক্ষক তৈরি হচ্ছে না। বিদেশে মেডিকেলে এই বিষয়ে লেখাপড়া করে শুধু মেডিকেল কলেজে নয় পুলিশ ও আর্মি ফোর্সে কাজ করা যায়, কিন্তু আমাদের দেশে এই সুযোগ কম। তাই অনেকে মনে করেন এভাবে চলতে থাকলে এক সময় এমবিবিএস, ¯œাতোকোত্তর, ডিপ্লোমা কোর্সের প্রশ্নপত্র, ক্লাশ, পরীক্ষা এবং খাতা দেখা সহ সার্বিক বিষয়ে দক্ষ মানুষ পাওয়া যাবেনা। তবে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসকদের আগ্রহী করতে সরকারের উচিত এই বিভাগের ডাক্তারদের জন্য আলাদা সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা রাখা তাহলে কেউ না কেউ অনুপ্রাণিত হবে। পাশাপাশি ডাক্তারদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই হয়তো জনবল সংকট কিছুটা হলেও কেটে যাবে।
এব্যাপারে ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. কামদা প্রসাদ সাহা জানান, মৃত দেহের ময়নাতদন্ত কেন করি আমি নিজেই জানিনা। কেননা আমি একাডেমিক শিক্ষক। আমার কাজ হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা। তাছাড়া ফরেনসিক বিভাগটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। আমি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কাজ করছি। এই বিভাগে যে পরিমান জনবল দরকার সে পরিমান নেই। তিনজন ডাক্তার, একজন পিয়ন, একজন আয়া আর একজন ডুম দিয়ে চলে এই বিভাগটি। এই বিভাগে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে, বন্ধের দিন, রাতেও কাজ করতে হয়। কিন্তু তারপরেও এই বিভাগটিকে জরুরী বিভাগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য অতিরিক্ত কোন সরকারি ভাতাও দেওয়া হয়না। তাই অনেক ডাক্তার এই বিভাগে কাজ করতে এসে চলে যায় এবং কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করে।
এব্যাপারে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মহসিনউজ্জামান চৌধুরী জানান, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে ডাক্তার স্বল্পতা রয়েছে। আমরা এব্যাপারটি নিয়ে উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করেছি। কলেজে পর্যাপ্ত জনবল সংকট রয়েছে। জনবলের তুলনায় কাজের পরিমান অনেক বেশি। তাছাড়া ফরেনসিক বিভাগে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়।স্পর্শকাতর এই বিভাগে যারা কাজ করে তাদের কোন রকম ইনটেনসিভ না থাকায় ডাক্তারগন কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করে। মেডিকেল রিপোর্ট দিলে কারো বিপক্ষে আবার কাহারো পক্ষে যায়। নানা মামলাতে এ বিভাগের শিক্ষকদের স্বাক্ষী দিতে হয়। সেখানে ও নিরাপত্তার অভাব রয়েছে। তাই কেউ বাধ্য না হলে এই বিভাগে আসতে চাননা। আবার এই বিভাগের ডাক্তারদের নানা কারণে অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতির স্বীকার হতে হয় ।

No comments:
Post a Comment