বিভিন্ন অনুষ্ঠান মালার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হচ্ছে বর্ষবরণ পহেলা বৈশাখ ।

বশিরুল ইসলাম:

সারাদেশের ন্যায় কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন স্থানে  প্রশাসন সহ উপজেলা প্রশাসন বর্ষবরণ উপলক্ষে আয়োজন করেছে নানা অনুষ্ঠান মালার। কুমিল্লা ধর্মসাগর পারস্থ জামতলায় এবং মহিলা কলেজ মাঠে কুমিল্লা সাংস্কৃতিক জোটের কর্মীরা নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। বিশে^র সকল প্রান্তের সকল বাঙ্গালী আজ নতুন বছরকে বরণ করছে বাংলা নব বর্ষ । ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছে অতীতের সকল দুঃখ, গ্লানি। সকলের কামনা  যেন নতুন বছরটি সুন্দর ও সুখকর হয়। ব্যবসায়ীরা নতুন করে ব্যবসা শুরু করার লক্ষে এই দিনটিকে বরণ করে নেয়। বাঙ্গালীরা এই দিনে ভাল ভাল খাবারের আয়োজন করে। আত্মী স্বজনদের সাথে দেখা সাক্ষাত করে। তবে এই দিনের সাথে পান্তা ইলিশ কিংবা ধর্মীয়  কোন সম্পর্ক নেই এবং পান্তা ইলিশ খেতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা ও নেই। বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস এবং বৈশাখের ১তারিখ পহেলা বৈশাখ আজ । বাংলা সনের প্রথম দিন তথা বাংলা নব বর্ষ। দিনটি বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিম বঙ্গে শুভ নববর্ষ হিসেবে পালিত হয়। ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙ্গালীরা ও এই উৎসবে অংশ নেয়। সে হিসেবে এটি বাঙ্গালীদের একটি সার্বজনিন উৎসব। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিম বঙ্গে সকল সরকারি বে-সরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। বিশে^র বিভিন্ন দেশে বাংলা ভাষাভাষি লোকজন পহেলা বৈশাখে নানা অনুষ্ঠান ও খাবারের আয়োজন করে থাকে। গত বছর থেকে বাঙ্গালী তথা বাংলা ভাষার লোকজন একটু ব্যতিক্রম আয়োজন করছে। পহেলা বৈশাখে ইলিশ মাছ খাবার বন্ধ রাখার ঘোষনা করছে। কেননা এই সময়ে মা ইলিশ ধরা হয়ে থাকে ফলে ইলিশের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার আশংকা থাকে। তাই বাঙ্গালী গত বছর থেকে পহেলা বৈশাখের দিন ইলিশ খাওয়াকে একটু কম গুরুত্ব দিচ্ছে। ইলিশের প্রজনন মৌসুমের এই সময়ে জাটকা নিধন কমাতে সরকারের পক্ষ থেকে বৈশাখে ইলিশ বর্জনের ঘোষনা দিয়েছে। নববর্ষের সাথে পান্তা ইলিশের কোন সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 
মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো জানান,  গত বছর থেকে খাবারের মেনুতে ইলিশ মাছ বাদ দিয়েছি । গত ১২ এপ্রিল বুধবার তার নিজ কার্যালয়ে বলেন মঙ্গল শোভা যাত্রার সাথে ধর্মীয় কোন সম্পর্ক নেই এবং এই নিয়ে কেউ যেন কোন রকম বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশ না করে। মঙ্গল শব্দটি যদিও মনে হয় হিন্দু শব্দ কিন্তু এটির সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই। এটি বাঙ্গালীর সাংস্কৃতিক উৎসব।  
প্রজননের সময় অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ইলিশ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়াও অভয়াশ্রম গুলোতে মার্চ ও এপ্রিল মাসে  ইলিশ শিকার বেআইনী ঘোষনা করেছে সরকার। মাছের প্রজনন ক্ষমতা বাড়ানো, মাছের অতিরিক্ত দাম যেন না বাড়ে এরকম বিভিন্ন কারণে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসকগন পহেলা বৈশাখে ইলিশ বর্জনের ঘোষনা দিয়েছেন। 
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ভারত বর্ষে মুঘল স¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর স¤্রাটরা কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করতো। কিন্তু হিজরী সন চাদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ের কৃষকদেরকে খাজনা পরিষদে বাধ্য করা হতো। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের জন্য মুঘল স¤্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। 
১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০-১১ মার্চ  থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয় এবং কার্যকরী হয় স¤্রাট আকবর সিংহাসন আরোহনের সময় ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলী সন পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলাবর্ষ নামে পরিচিত হয়। মূলত স¤্রাট আকবরের আমল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন সবাই চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজন মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হত। পরদিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ এলাকার লোকদের মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতো। আর এই উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো এবং সেই থেকে এটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমান অবস্থায় এসে দাড়িয়েছে। তখল এই দিনটির প্রধান ঘটনা বা উদ্দেশ্য ছিল হালখাতা তৈরি করা বা নতুন হিসাব বই খোলা। 
আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্ত্তণ ও পূজার আয়োজন করা হয়। পরে ১৯৩৮ সালে ও একই রকম ভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ১৯৬৭ সন থেকে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয়। 

নতুন বছরের উৎসবের সংঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্টির কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ। গ্রামে মানুষ ভোরে ঘুম থেকে  উঠে, নতুন জামা কাপড় পরে এবং আতœীয় স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে যায়। বাড়িঘড় পরিস্কার করা হয় এবং সুন্দর করে সাজানো হয়। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা ও থাকে। কয়েকটি গ্রামের মিলিত এলাকা, খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। মেলাতে থাকে নানা রকম কুঠির শিল্প জাত সামগ্রীর বিপণন, থাকে নানা রকম পিঠা পুলির আয়োজন। অকেন স্থানে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে।  এই দিনের একটি পুরুনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীন ক্রিয়া প্রতিযোগিতার আয়োজন এর মাধ্যে থাকে নৌকা বাইচ, লাঠি খেলা কিংবা কুস্তি। বাংলাদেশে এইরকম সবচেয়ে আসরটি হয় ১২ বৈশাখ, চট্টগ্রাম- এর লালদিঘী ময়দান । এটি জব্বারের বলি খেলা নামে পরিচিত । এই দিনে ঢাকায় রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ ও মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করে থাকে । বাংলাদেশে রাজধানী ঢাকা শহরে পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানে অনুষ্ঠিত হয় রমনা বটমূলে  পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলত কণ্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে আহ্বান জানান । স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃত পক্ষে যে গাছের ছায়ার মঞ্চ তৈরি হয় সেটি বট গাছ নয় , অশ^ গাছ। ১৯৬০- এর দশকে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠির নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ  অনুষ্ঠানের সূচনা । ঢাকার বৈশাখী উৎসবের একটি আবিশ্যিক অঙ্গ মঙ্গল শোভা যাত্রা । ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখে সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয় । এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয় । শোভাযাত্রা সকল শ্রেণী পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে । শোভাযাত্রার জন্য বানানো হয় রং-বেরঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিলিপি । ১৯৮৯সাল থেকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের উৎসবের একটি অন্যতম আকর্ষণ । ঈশা খাঁর সোনারগাঁয় ব্যতিক্রমী এক মেলা বসে , যার নাম বউমেলা । জয়রামপুর গ্রামের মানুষের ধারণা, প্রায় ১০০ বছর ধরে পয়লা বৈশাখে শুরু হওয়া এই মেলা পাঁচ দিনব্যাপী চলে । প্রাচীন একটি বটবৃক্ষের নিচে এই মেলা বসে, যদিও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সিদ্ধেশ^রী দেবীর পুজো হিসেবে এখানে সমবেত হয় । বিশেষ করে কুমারী , নববধূ , এমনকি জননীরা পর্যন্ত তাদের মনস্কামনা পূরণের আশায় এই মেলায় এসে পূজা অর্চনা করেন । সন্দেশ-মিষ্টি-ধান-দূর্বার সঙ্গে মৌসুমি ফলমূল নিবেদন করে ভক্তরা । পাঁঠাবলির রেওয়াজও পুরনো। বদলে যাচ্ছে পুরনো অর্চনার পালা । এখন কপোত- কপোতি উড়িয়ে শান্তি বার্তা পেতে চায় ভক্তরা দেবীর কাছ থেকে । বইমেলায় কাঙ্খিত মানুষের খোঁজে কাঙ্খিত মানসীর প্রার্থনা কিংবা গান্ধর্ব প্রণয়ও যে ঘটে না সবার অলক্ষে, তা কে বলতে পারবে । বন্দর নগরী চট্রগ্রামে পহেলা বৈশাখের উৎসবের মূল কেন্দ্র ডিসি পাহাড় পার্ক । সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে এখানে পুরোনে বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করার জন্য দুই দিনের অনুষ্ঠানের আয়োজনের করা হয় । মুক্ত মঞ্চে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি থাকবে নানা গ্রামীণ পন্যের পশরা । থাকে পান্তা ইলিশের ব্যবস্থাও । চট্রগ্রামে সম্মিলিত ভাবে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের উদ্যোগ ১৯৭৩, ১৯৭৪ ও ১৯৭৫ সালে । রাজনৈতিক ব্যক্তিদের চেষ্টায় উদযাপিত হয়ে আসছে । ইস্পাহানী পাহাড়ের পাদদেশে এই অনুষ্ঠান আয়োজিত হয় । ১৯৭৮ সালে এই উৎসব এখন ডিসি হিল পার্কে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে । বাংলাদেশের পার্বত্য চট্রগ্রাম এলাকার প্রধান তিনটি হ্মুদ্রজাতিস্বত্তা রয়েছে যাদের প্রত্যেকেরই বছরের নতুন  দিনে উৎসব আছে । ত্রিপুরাদের বৈশুখ, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু উৎসব । বর্তমানে তিনটি জাতিস্বত্ত¦া একত্রে এই উৎসবটি পালন করে । যৌথ এই উৎসবের নাম বৈসাবি । উৎসবের নানা দিক রয়েছে । এর মধ্যে একটি হলো মার্মাদের পানি উৎসব । বাংলাদেশ এবং ভারত ছাড়াও পৃথিবীর আরো নানান দেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়ে থাকে । অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শহরে যেমন ঃ সিডনি , মেলবোর্ন , ক্যানবেরাতে বৈশাখী মেলার মাধ্যমে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয় । বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ নাচ- গান- ফ্যাশন শো- খাবারের মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতির এ ধারাকে আনন্দময় করে তোলে । অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে সর্ববৃহৎ বৈশাখী মেলা অনুুষ্ঠিত হয়।  আগে বার্নউড বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হলেও ২০০৬ সাল থেকে সিডনি অলিম্পিক পার্কে মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। মেলায় বিপুল পরিমাণ লোকের সমাগন ঘটে এবং প্রবাসী বাঙালিদের জন্য এটি একটি আনন্দঘন দিন । সুইডেনেও বিপুল উৎসাহের সাথে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়। ইংল্যান্ড অবস্থানকারি বাঙ্গালীরা স্ট্রীট ফেস্টিভাল (পথ উৎসব)  পালন করে। এই উৎসবটি লন্ডনে ও করা হয়। 

No comments:

Post a Comment