চান্দিনার ঘুরঘার বিলে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ।

বশিরুল ইসলাম:
কুমিল্লা জেলায়  চান্দিনা, দাউদকান্দি ও কচুয়া এলাকা নিয়ে বিস্তৃত ঘোরঘার বিল। এই বিলটি প্লাবন ও মৌসুম প্রকৃতির। শুষ্ক মৌসুমে ১৫০হেক্টর ও বর্ষা মৌসুমে ১৭৫ হেক্টর জমি প্লাবিত থাকে। বিলটির সর্বোচ্চ গভীরতা প্রায় ৩ থেকে ৪মিটার । ¯্রােতের অবস্থা ছয় মাসের কম। খালের সাথে সংযুক্ত এই বিলটির মৎস্য কার্যক্রম প্রাকৃতিক।  এই বিলে শোল, বোয়াল, গজার, আইর, মাগুর, শিং,কার্প, পলি, মলা, ঢেলা, পুটি, বেধা, কৈ, পাবদা, টেংরা, চাপিলা, বুজুরি, টাকি, রুই, কাতলা, সরপুটি, কাঞ্চনপুটি, জাতপুটি, চিংড়ি, বাইং, মেনি, দারকিলা, তারা বাইং ইত্যাদি মাছ পাওয়া যেত। প্রাকৃতিক উপায়ে এই ধরণের মাছ উৎপাদন ওপ্রজনন হয়। কিন্তু নানা কারণে ছোট হয়ে আসছে বিলের আয়তন । 

বর্তমানে বিলুপ্ত প্রায় মাছ ও উদ্ভিদ গুলো হলো আইর, মধুপদ্মা, ঢেলা, শরপুটি ও পটকা, জলজ প্রকৃতির প্রজাতির চিংড়ি, কচ্ছপ, কুচিয়া, আগাছা কচুরিপানা, খুদিপানা, হেলেঞ্চা, কলমি, শাপলা। উক্ত বিল বা প্লাবন ভুমি থেকে সুফল ভোগীর সংখ্যা প্রায় ১২৪৫জন, এদের মধ্যে মহিলা ২৪৫জন এবং পুরুষ ১হাজার । মাছ ধরার জন্য বেরজাল, খড়জাল, ভেসাজাল, ফেলুন জাল, ঝাকিজাল, মৌয়াজাল ব্যবহার হয়ে থাকে। এই ঘুরঘার বিলে ছোট প্রজাতির মাছ উৎপাদন হয় ৬মাসে ১,৭০,০০০হাজার কেজি। তবে ধীরে ধীরে ঘুরঘার বিলের দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলিন হওয়ার পথে। বিলিন হওয়ার কিছু কারণ হলো-অবৈধ কারেন্টজাল দ্বারা দেশীয় প্রজাতির পোনা নিধন, জমিতে কীটনাশকের ব্যবহার, বহিরাগতদের দ্বারা মৎস্য নিধন, পর্যাপ্ত সুরজ গেইট না থাকা, মাছের বংশ বিস্তারে বাধা সৃষ্টি করা। তাই দেশীয় প্রজাতির মাছ গুলো যেন বিলীন না হয় সেজন্য সংযোগ খাল গুলো পুন: খনন, তিন কিংবা চারটি মাছের অভয়াশ্রম স্থাপন, বিলে পোনা অবমুক্তকরণ ও সমাজ ভিত্তিক বিল সচেতনতা বৃদ্ধি।  
 এই ঘুরঘার বিলটি দেশীয় মৎস্য ভান্ডার খ্যাত থাকলে ও ক্রমশই বিলীন হয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ। অথচ এই ঘুরঘার বিলে এক সময় প্রায় দুই শতাধিকের ও বেশি প্রজাতির মাছ ছিল এখন কোন রকম ষাট প্রজাতির মাছ দেখা যায়। কিন্তু এই অল্প প্রজাতির মাছ দেখা গেলেও দেশীয় প্রজাতির মাছ হুমকির মুখে। তবে দেশীয় প্রজাতির মাছ গুলো হারিয়ে যাওয়ার পেছনে কিছু কারণ রয়েছে। কারণ গুলোর মধ্যে অন্যতম খালের নাব্যতা হ্রাস, খাল ভরাট করে বাড়ি নির্মাণ, রাস্তা ঘাট নির্মাণ, মাছের আশ্রমের স্থান গুলোতে চাষাবাদ এবং সেখানে মাত্রারিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, অপরিকল্পিত ভাবে বাধ নির্মাণ ও ডিমওয়ালা মাছ গুলো ডিম দেওয়ার পূর্বেই ধরে ফেলা, কারেন্ট জালের ব্যবহার বেড়ে যাওয়া, নতুন পানি আসার সাথে সাথে ডিম থেকে ফুটে আসা ছোট মাছ গুলো ধরে ফেলা, প্রকৃত জেলেরা এই পেশা ছেরে অন্য পেশায় চলে যাওয়া। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে প্রায় ৭৩ ভাগ মাছই প্রাকৃতিক মাছ। দেশের রপ্তানী আয়ের প্রায় ৬ ভাগই বৈদেশিক অর্থ লাভ করে থাকে এর মধ্যে জাতীয় আয়ের ৫ভাগই অর্জন হয় মৎস্য সম্পদ থেকে। তাই দরকার মাছের জন্ম স্থান গুলোতে অভয়াশ্রম এবং গনসচেতনতা বৃদ্ধি করা তানা হলে দেশীয় প্রজাতির মাছ গুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। 
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রাধেশ্ব্যাম বৈষ্ণব জানান,  ঘুরঘার বিলটি দৈর্ঘ্যে তের মাইল এবং প্রস্থে ছয় মাইল। এই ঘুরঘার বিলে ছোট বড় খাল, পুকুর ও খাটিতে টিকে আছে মিঠা পানির মাছ।
এই বিলে পূর্বে প্রচুর পরিমানে ছোট প্রজাতির মাছ পাওয়া গেলে ও বর্তমানে তা আর সম্ভব হচ্ছেনা। যখন বর্ষা আসে তখন মাছ প্রাকৃতিকভাবে বড় হয় আর বর্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথে বড় মাছ গুলো ডিম দিয়ে চলে যায় সেই ডিম থেকে পরের বছর নতুন পানি আসার সাথে সাথে ছোট মাছ প্রাকৃতিক উপায়ে প্রজনন হয়। কিন্তু বর্তমানে ইরি চাষের কারণে এই ডিম গুলো যথা সময়ে প্রজনন হতে পারছেনা। আবার বর্ষার পরও খাটিতে কিংবা খালে থাকা মাছ গুলো সেচ করে ধরে ফেলা হয়।  আশার কথা হলো এই যে, মাছের উৎপাদন ভাড়ানোর জন্য এবং এই বিলে দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ইতোমধ্যে জেলা মৎস্য উন্নয়ন কার্যালয়ে ঘোরঘার বিলে মাছের অভয়াশ্রম তৈরি করার জন্য চাহিদা পত্র পাঠানো হয়েছে এবং আশা করি এই অর্থ বছরে আমরা ঘোরঘার বিলে  অভয়শ্রাম তৈরি করতে সক্ষম হবো। দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষা করার জন্য সরকারি ভাবে আমাদের নিকট কিছু বরাদ্ধ এসেছে। আমরা এই টাকা গুলো কাজে লাগিয়ে দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদ বাড়ানোর চেষ্টা করছি।
গল্লাই ইউনিয়নের মিরাখলা গ্রামের মো: নাছির মুন্সী জানান, গত দশ বছর আগে ও মাছের গন্ধে ঘুরঘার বিলের পাশ দিয়ে যাওয়া যেতনা। কিন্তু কয়েক বছর হলো সে অবস্থা আর নেই। এই মাছ গুলো ইরি চাষ, খাল ভরাট করে বাড়ি নির্মাণ, খালে বাধ নির্মাণ সহ কারেন্ট জালের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় ছোট প্রজাতির প্রাকৃতিক মাছ গুলো দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে। 

No comments:

Post a Comment